শরণার্থী থেকে রোডস স্কলার হয়ে ওঠার অভূতপূর্ব যাত্রা

বৈচিত্র ডেস্ক : পাকিস্তানে একজন আফগান শরণার্থী হিসেবে বড় হওয়া সামিয়া তোরার জীবনে রক্তপাত যেন ছিলো রোজকার ঘটনা।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে পেশোয়ারে আরো চারটি পরিবারের সঙ্গে তারা যে বাড়িতে থাকতেন, সেখানে তাদের ছিলো একটি মাত্র শোবার ঘর।

প্রায়ই ড্রোনের শব্দ শোনা যেত। নব্বই এর দশকে আফগানিস্তানে তালিবানদের উত্থানের পর তার পরিবার পাকিস্তানে পালিয়ে চলে আসে।

সামিয়া বলেন, “আমি সংঘাত সহিংসতার মধ্যেই বড় হয়েছি, কিন্তু আমার তো কিছু করার ছিলো না।”

মাঝে মাঝেই সপ্তাহে এক-দুবার বোমা পড়তো।

“কখনো এমন হত যে লোকে এ নিয়ে আর কথাই বলতো না। যেন এটা হবার কথা ছিল, তাই এ নিয়ে সময় নষ্ট না করে লোকে নিজের কাজে মন দিত।”

কিন্তু তারপরেও আফগানিস্তানের তুলনায় পাকিস্তানে অনেক ভালো ছিলেন তারা।

বিবিসিকে সামিয়া বলছিলেন, তার কারণ পাকিস্তানে তারা অন্তত স্কুলে যেতে পারছিলেন।

সামিয়ার মনে আছে, ২০০২ সালে পরিবারের সঙ্গে কাবুলে বেরাতে গিয়েছিলেন তারা, তখন মাত্র দেশটিতে মার্কিন হামলা শুরু হয়েছে।

সেখানে তিনি দেখেছেন, কোন মেয়েকে স্কুলে যেতে হলে ছেলে সেজে যেতে হয়।

তার বয়স তখন মাত্র ছয় বছর, সেসময়ই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, লেখাপড়া ঠিকমত করবেন।

দেখা যাচ্ছে, লেখাপড়া ঠিকমতই করেছিলেন সামিয়া।

আসছে অক্টোবরে ২২ বছর বয়সী সামিয়া প্রথম আফগান হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে নামী আর পুরনো বৃত্তিগুলোর একটি রোডস স্কলারশিপের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রী নিতে যাচ্ছেন।

সামিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে আর্লহ্যাম কলেজে পড়াশোনা করছেন।

পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা পরিষ্কার। আর সারাক্ষণ হাসি মুখ দেখে ও তার প্রাণবন্ত কথাবার্তা শুনে বোঝার উপায় নেই একজন শরণার্থী থেকে একজন রোডস স্কলার হবার জন্য তাকে কতটা কঠিন রাস্তা পাড়ি দিতে হয়েছে।

যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে

আফগানিস্তানে এখনো শিক্ষিত নারী সংখ্যায় বিরল। ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে নারীদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার এখন ১৭ শতাংশ।

যদিও পাকিস্তানেও এ হার কম, সেখানে ৪৫ শতাংশের মত নারী পড়তে পারেন, স্কুলে যেতে পারেন।

উল্টোদিকে, তার নিজের দেশে সামর্থ্য থাকলেও অনেক মেয়েকে স্কুলে পাঠানো হয় না।

সামিয়া মনে করেন ঐ পুরো অঞ্চলের অভাব আর বিপদসঙ্কুলতার কারণে তাকে পাকিস্তানে বেড়ে উঠতে হয়েছে।

২০০৪ সাল থেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর দিয়ে হাজার হাজার ড্রোন উড়ে গেছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কয়েক দশক ব্যাপী লড়াইয়ে খাইবার পাখতুনখোয়ার পেশোয়ার একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।

২০১৪ সালে জঙ্গিদের বোমায় ১৩৯জন শিশু নিহত হয়েছিল, যে ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে শিশুদের ওপর বর্বরতার অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সে বছরই সামিয়া পাকিস্তান ছাড়ে।

“ওখানে সব সময়ই একটা টেনশন, একটা চাপ মাথার ওপর ছিল। সব সময় নিজেকে অনিরাপদ মনে হত। কারণ যেকোনো সময় যে কোন কিছু ঘটতে পারে।”

সেখানে পড়াশুনাটা যেন ছিল পরিস্থিতি থেকে পালানোর জন্য সামিয়ার একটা কৌশল।

কিন্তু শরণার্থী হিসেবে তার পরিবারের খুব সীমিত অধিকার ছিল সবকিছুতে।

শরণার্থী হবার কারণে তার বাবা ড্রাইভিং লাইসেন্স পাননি, আর সামিয়ার পড়াশুনার ক্ষেত্রেও ছিল নানা বাধা।

যে কারণে পড়াশুনার জন্য ভিন্ন জায়গা খুঁজতে হয়েছে তাকে।

জীবন-বাজি রেখেছিলেন তিনি

একদিন হঠাৎ অনলাইনে খুঁজতে গিয়ে সামিয়া একটি হাইস্কুল খুঁজে পান, ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজ ইউডাব্লিউসি।

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী ছড়ানো তাদের ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পাসে বিদেশী শিক্ষার্থীদের পড়ার ব্যবস্থা করে।

নিউ মেক্সিকোতে ওই স্কুলে সুযোগ পাবার ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহিংসতার ইতিহাস।

২০১৪ সালের মার্চে কাবুলের যে হোটেলে বসে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন, তার পর দিনই সেখানে হামলা চালায় তালিবান।

সেরেনা হোটেলে সেই হামলায় ইউডাব্লিউসি’র সিলেকশন কমিটির প্রধান রোশান থমাস-সহ নয়জন নিহত হয়েছিলেন।

সামিয়ার মনে আছে, ড. থমাস কিভাবে পরীক্ষার দিন সবাইকে উৎসাহিত করছিলেন আর বলেছিলেন, একদিন তারা যেন আফগানিস্তানে ফিরে এসে নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগায়।

রোডস স্কলারশিপের ইতিহাসে ব্যতিক্রম

বিশ্বের সবচেয়ে নামী আর পুরনো বৃত্তিগুলোর একটি রোডস স্কলারশিপ ১৯০২ সালে যখন চালু হয়, সেসময় যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্দেশ্যে অক্সফোর্ডে এ বৃত্তি চালু করা হয়েছিল।

এর ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় জুড়ে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশের নাগরিকদের এই বৃত্তি দেয়া হয়।

ভিন্ন বর্ণের এবং বিশেষত নারীদের সুযোগ কম দেয় এমন কারণে সামিয়া শুরুতে এতে আবেদনই করতে চাননি।

কিন্তু পরে যখন করলেন এবং পেলেন, তিনি এখন ভাবছেন “নিজের ঔপনিবেশিক ইতিহাস ভুলে যাবার বদলে, সেটা কাজে লাগিয়ে যদি রোডসের ধারা পরিবর্তন করা যায়, সেটাই হবে বড় লাভ।”

আধুনিক আফগানিস্তানের স্বপ্ন

সামিয়া রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রান্ট মুভমেন্ট নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী নিতে চান, এবং এরপর নিজের দেশ আফগানিস্তানে ফেরত যেতে চান।

নিজে যে আফগানিস্তানকে চেনেন তা এক বিধ্বস্ত ও ফাঁকা শহরের দেশ, সেখানে ফিরতে চান না তিনি।

কিন্তু তার বাবার কাছে গল্প শুনে যে আফগানিস্তানকে তিনি চিনেছেন ঝলমলে দেশ হিসেবে সেখানে তিনি ফিরতে চান।

“আমি সব সময় কল্পনা করেছি একটা উপত্যকা, যেখানে পাহাড় আর নদী থাকবে। আর থাকবে নকশা করা বড় বড় সুন্দর বাড়ি-ঘর। শুকনো ফল আর বাদাম, আর তাজা ফল থাকবে রাস্তায়—খুবই আধুনিক এক আফগানিস্তান হবে সেটা।”

আর তার মত যারা উন্নত জীবনের সুযোগ সুবিধাগুলো পেয়েছেন, তাদেরকেই সেই আফগানিস্তান গড়তে হবে।

বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *