ফজল শাহাবুদ্দীন : তাঁর ছায়া তাঁর স্মৃতি

194359_181শাহীন রেজা :   তিনি মৃত্যুর কথা এলেই বলতেন, ‘মৃত্যু কিছু নয়। মৃত্যু মানেই এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে যাত্রা মাত্র।’ বলতেন, ‘আমরা কেউ মরি না’। আমার কেন যেন সবসময় তাঁর এই কথাগুলো মনে পড়ে। ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর অন্য পৃথিবী যাত্রার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। মৃত্যুর পরে দেহের বিনাশ ঘটে কিন্তু আত্মার? আত্মারা অমর। তাঁর প্রিয় স্থান, হারুন এন্টারপ্রাইজের দোতলাটি এখন আর নেই। ১৫ নিউ বেইলি রোডের বৈচিত্র্যের সেই অফিসটাতেও এখন আর আমি বসি না। এ দু’স্থানে অপার শূন্যতা। নয়াদিগন্তের পুরানো সেই অফিসের নিচে যে চায়ের দোকানটাতে আমরা আড্ডা দিতাম- আমি, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, জাকির আবু জাফর, নুরুল হক, জামসেদ ওয়াজেদ ফরিদ ভূঁইয়া এবং আরো অনেকে, সে হোটেলটাতে এখন আর আমরা কেউ যাই না। নয়াদিগন্ত এখন ইত্তেফাক ভবনে। আগের সেই আড্ডাটাও আর নেই। তিনি চলে যাবার পর আমাদের চিরচেনা সেই আড্ডাগুলো ভেঙে গেছে। কথা থেকে সুর হারিয়ে গেলে আর কি সঙ্গীত হয়?
ফজল ভাই, আমাদের প্রিয় ফজল শাহাবুদ্দীন, হৃদপিন্ডটাকে এফোড় ওফোড় করে দিয়ে যিনি পাড়ি জমিয়েছেন অন্য কোথাও, তিনি কি আর ফিরে আসবেন কখনো- কোনো দিন? আবার কি আমরা মিলিত হবো হারুন ডাইরিতে, বৈচিত্র্য অফিস কিংবা নয়া দিগন্তের নিচের টি-স্টলে, বুড়িগঙ্গার ধারে ব্রিজের উপরে, মাওয়া সড়কে কিংবা শেরাটনের কফিশপে? হয়তো না। এই ‘না’ টাকে যত নিশ্চিতভাবে উচ্চারণ করছি ততটাই গভীর কষ্টে ভরে যাচ্ছে বুকটা। আমাদের সকলকেই একদিন চলে যেতে হবে, পৃথিবী ছেড়ে এই চলে যাবার মতো ধ্রুব সত্য আর কিছু নেই। এ লেখাটি লিখতে বসে ফজল ভাইয়ের সেই অসাধারণ কবিতাটি মনেপড়লো। আর সেইসাথে এক অবিস্মরণীয় অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র শরীরে, সমস্ত আত্মায়-

‘আমরা মরিয়া গেলে পৃথিবাটা থাকিবে বাঁচিয়া
একথা ভাবিতে বড় কষ্ট লাগে বড় নিদারুণ
আমরা থাকিব না কিন্তু প্রজাপতি নাচিয়া নাচিয়া
খেলিবে বর্ণাঢ্য খেলা, প্রেমে মত্ত তরুণী তরুণ

কী আশ্চর্য এই নিষ্ঠুর প্রকৃতি কী নিয়ম তার
যা কিছু পুরনো আর জীর্ণশীর্ণ, দেয় সে ফেলিয়া
নিজেকে সাজাতে আনে ক্রমাগত তারুণ্য সম্ভার
আমরা মরিয়া গিয়া উঠিব কি আবার জ্বলিয়া?’

ফজল ভাই চলে গেছেন। কিন্তু পৃথিবীটা বেঁচে আছে ঠিক তার কবিতার মতো। জীবদ্দশায় যা ভাবতে তাঁর কষ্ট হয়েছিল। তিনি নেই কিন্তু প্রজাপতিকূল ফুলে ফুলে নেচে নেচে বর্ণাঢ্য খেলা খেলছে, প্রেমে মত্ত হচ্ছে তরুণ তরুণী- এ সত্যিই এক নির্মম নিয়ম। নিষ্ঠুর প্রকৃতি যেন আবদ্ধ এই কঠিন নিয়মে। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি কারো ক্ষেত্রে। না কবি-না সাধারণ মানুষ। পার্থক্য এই, সাধারণ মানুষ ভবিষ্যত নিয়ে ভাবে না- ভাবতে পারেও না। কবিরা পারেন। তারা ভাবেন আর সেই ভাবনা শব্দমালায় গেঁথে লিপিবদ্ধ করে যান- যাকে আমরা বলি- ‘কবিতা’।
ফজল ভাই নেই, রয়ে গেছে তাঁর কথা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর কবিতা। কবিতা তো সবার জন্য কিন্তু কথা, স্মৃতি- এগুলো তো যারযার তারতার। ফজল ভাইয়ের সাথে কতো কথা কতো স্মৃতি- আমার, আমাদের। তাঁর সাথে আড্ডায় কেটে গেছে কতো বিষন্ন দুপুর। কতো শীতল সায়াহ্নকে আমরা উষ্ণ করে তুলেছি কথায়-কথায়, কবিতায়। আড্ডা,কবিতার খোরাক যোগায়। আড্ডায় ভাব ও ভাষার বিনিময়ে কবি সমৃদ্ধ হন, উজ্জীবিত হন। ফজল ভাই নেই, তাই আড্ডাও নেই। ফজল ভাইকে ছাড়া আড্ডা হবে- এ যেন ভাবনারও অতীত।
ফজল শাহাবুদ্দীনের অফিসে আড্ডায় কতজনকে পেয়েছি। কতোজনের সাথে সম্পর্কের নিবিড়তা সৃষ্টি হয়েছে হারুন ডাইরীর সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছোট্ট কক্ষটিতে। কে না গেছেন ওখানে। সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী থেকে শুরু করে একালের তুর্কীতরুণ সানজীদ নিশান চেীধুরী, রাজু আলীম, জামাল উদ্দিন বারী, তৌফিক জহুর কিংবা সাবিত সারওয়ার পর্যন্ত সবাই সিক্ত হয়েছে সেই আড্ডায়, ধন্য হয়েছে আতিথেয়তায়। জানি না আজ যারা বেঁচে আছেন তারা সেই আড্ডার উষ্ণতা হৃদয়ে অনুভব করেন কি’না। আজ খুব জানতে ইচ্ছে হয়, কঠোর কোমলে মিশানো সেই ¯েœহার্দ্র বন্ধুবৎসল মানুষটিকে ভেবে কারো হৃদয় সিক্ত হয় কি’না? কেউ তাকে ভেবে অগোচরে কোন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কি’না অথবা একফোঁটা চোখের জল?
ফজল শাহাবুদ্দীন সবসময় আনন্দের মাঝে থাকতে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, ‘যতোদিন বেঁচে আছো, ততোদিন আনন্দ করে যাও’। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুখের আয়ু ক্ষণকাল, আর কষ্টের পরিধি দীর্ঘতর। পাশের মানুষগুলোকে কবিতায়, হাসিতে, কৌতুকে মাতিয়ে রাখতে জুড়ি ছিল না তাঁর। তিনি দুষ্টুমি করে একেক জনকে একেক নামে ডাকতেন। ইচ্ছে করে নাম ভুলে যাবার অভিনয় করতেন। আমার অফিসের দীপংকর বড়ুয়াকে তিনি ডাকতেন, ‘ভয়ংকর বাবু’ নামে। কবি ত্রিদিব দস্তিদারকে বলতেন, ‘ডিবি কবি’। চিরচেনা মানুষটিকে হঠাৎ যখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, ‘এ্যাই তোমার নাম কি?’ তখন সে লোকটির সাথে সাথে উপস্থিত সকলেই চমকে উঠতেন। একদিন তার অফিসে একলোক এসে জানতে চাইলেন,‘আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি?’ ফজল ভাই অবলীলায় বললেন, ‘দুটি’। আমরা তো অবাক। সজল আরেফিন মিটিমিটি হাসছেন।
৮ পৃষ্ঠার পর

আমি বললাম, ‘এটা কি বলছেন ফজল ভাই?’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কেন আমি কি ভুল বলছি? আমার তো দুটি সন্তান, দিনা আর অমি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম,‘তাহলে শমি কে?’ তিনি লজ্জিত হেসে জিভ কেটে বললেন, ‘সরি। আমারতো আরো একটা ছেলে আছে। ওর নাম শমি। ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকে।’ আমাকে বললেন, ‘এইটা তোমার ভাবীকে জানাইও না মিয়া। আমাকে খুন করে ফেলবে।’ আমরা সবাই তো হেসে খুন। এইটা যে তিনি ইচ্ছে করেই করেছেন তা কারো বুঝতে কষ্ট হয়নি। ফজল ভাই আমার কাছে তিনি ছিলেন পিতার মতো। তাকে আমি ‘কাব্যপিতা’ বলতাম। ফজল ভাইয়ের মৃত্যুর দুই বছর পর আমি আমার পিতাকে হারাই। ৩০ জানুয়ারি ছিল আমার পিতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ফজল ভাইয়ের তৃতীয় প্রয়াণ দিবস ৯ ফেব্রুয়ারি। দুটি শোকের ব্যবধান কাছাকাছি- যেমন বাইরে তেমনি হৃদয়ে।
তেত্রিশ লক্ষতম জন্মদিনের স্বপ্নাচারী ফজল শাহাবুদ্দীন ‘জন্মদিন’কে ভালোবাসতেন খুব। নিজের জন্মদিন পালন করতেন ঘটা করে। প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি জন্মদিন উপলক্ষে ছাপাতেন চার রঙা পোষ্টার। ‘ফুলপ্রেমিক’ ফজল ভাই জন্মদিনে সবাইকে আহবান জানাতেন ‘ফুল’ নিয়ে আসতে। এই কবিতার রাজপুত্র ফুলের জলসায় প্রজাপতি হয়ে থাকতে চাইতেন।
নিজের জন্মদিনের মতো অন্যের জন্মদিনের প্রতিও আগ্রহ ছিলো তাঁর। রবীন্দ্রনাথ থেকে শাহীন রেজা- এই আগ্রহ থেকে বাদ যায়নি কেউ। বেশ ক’বার নিজ দায়িত্বে আমার জন্মদিন পালন করেছেন তিনি। কবিদের জন্মদিনে ছুটে গেছেন হৃদয়ের টানে। রেজাউদ্দিন স্টালিন, জাকির আবু জাফর, কামরুজ্জামান, এমনকি রুনু আঞ্জুমানের জন্মদিনেও মধ্যমনি হয়ে আলোকিত করেছেন আয়োজন স্থল। একের পর এক ঋদ্ধ কবিতার জন্ম দিয়ে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন কবিতার জগত ঠিক সেভাবে উৎসাহ এবং উপকরণ যুগিয়ে কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন কবিকুলকেও।
ফজল ভাই শুধু কবি হিসেবে নন, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। তাঁর মতো আন্তরিক ও বন্ধুবৎসল মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাঁর কবিতাগুলোর মতোই যেন তিনি। আমি তাঁকে খুঁজতে গেলেই বাংলাদেশকে খুঁজে পেতাম।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *