দেশে পরিবেশ আছে কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নেই : খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

bnimg-179825-2011-12-12 অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ১ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের বৈশিষ্ট্য এবং এর চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?
প্রস্তাবিত বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে বিকশিত হয়েছে এবং ব্যাপ্তি ঘটেছে, তাতে ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া অবাস্তব নয়। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার নিরিখে এটি একটি অবাস্তব বাজেট বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার অনেক বড়। গত বছর আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তা অর্জন করতে পারেনি। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের হার খুবই কম। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তার মাত্র ৫২ শতাংশ এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। আগামী বছর বাস্তবায়নের হার এর চেয়ে বেশি এদিক-ওদিক হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বাজেটের আকার হয়ে গেছে অনেক বড়। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি না।
দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের ব্যাপারে আগামী অর্থবছরে আরও নয়-ছয় হবে। কারণ আগামী বছর হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের বছর। আমরা বুঝি নির্বাচনের বছর এমনটি হতে পারে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীকে শক্ত হাতে প্রকল্প বাছাই করতে হবে। যেসব প্রকল্প এ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো রেখে অন্য প্রকল্প যেগুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ, তা বাতিল করে দিতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণকে খুশি করার জন্য এমপিরা যেসব প্রকল্প নিয়ে আসেন, তা বাতিল করে দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী যদি এমন শক্ত হতে পারেন, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা ত্বরান্বিত হতে পারে। অন্যথায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। আমি সন্দিহান, তিনি এ কাজটি করতে পারবেন কিনা। যদি অর্থমন্ত্রী এটা করতে না পারেন, তাহলে আগামী অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের অবস্থা আরও খারাপ হবে। এসব দিক বিবেচনায় আমি বলব, আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, তা একটি অদূরদর্শী বাজেট হিসেবে চিহ্নিত হবে। যদিও অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন এটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট। কিন্তু আমার মনে হয় অচিরেই তিনি নিজেই বুঝতে পারবেন অথবা ইতিহাসই বিবেচনা করে দেখবে এটি শ্রেষ্ঠ বাজেট নাকি অযৌক্তিক বাজেট। বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে যতগুলো বাজেট হয়েছে এটি তার মধ্যে সবচেয়ে জননিন্দিত বাজেট হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রস্তাবিত বাজেট তো একটি ঘাটতি বাজেট। এই ঘাটতি পূরণের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা কি পর্যাপ্ত বলে মনে করেন?
আগামী বছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তার ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। তিনি প্রথমবার যে বাজেট দিয়েছিলেন তার আকার ১ লাখ কোটি টাকা ছিল না। আগামী অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাবনা করা হয়েছে, তার ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। আমি মনে করি এটিও একটি অবাস্তব পরিকল্পনা। এই ঘাটতি তিনি পূরণ করতে পারবেন না। অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন এবং সঞ্চয়পত্রের টাকা থেকে এই ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করা হবে। সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক থেকে টাকা নিলে তার জন্য উচ্চ হারে সুদ প্রদান করতে হবে। সঞ্চয়পত্র থেকে তিনি কিছু টাকা পেতে পারেন। কিন্তু ব্যাংক থেকে তিনি কোনো টাকা পাবেন না। কারণ ব্যাংকের পায়ে তো তিনি কুড়াল মেরেছেন। অর্থমন্ত্রী ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের ওপর এক্সাইজ ডিউটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। জাতিসংঘের যতগুলো দেশ আছে তার কোনোটিতে এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো দেশেই আমানতকারীর অর্থের ওপর এক্সাইজ ডিউটি বসানো হয় না। অর্থমন্ত্রী যদি দেখাতে পারেন বিশ্বের একটি দেশেও এমন ব্যবস্থা আছে, যেখানে আমানতকারীর টাকার ওপর এক্সাইজ ডিউটি বসানো হয়, তাহলে আমরা অর্থমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত মেনে নেব। আর যদি তিনি এটা দেখাতে না পারেন, তাহলে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে। জেনে বা না জেনে হোক, তিনি একটি ব্যাংকবিধ্বংসী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এ জন্যই বলছি, বেসিক ব্যাংক তো তিনি জেনেই ধ্বংস করেছেন। সোনালী ব্যাংক তো জেনেই ধ্বংস করেছেন। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকা হলো? তিনি জেনেই তো এসব করেছেন। আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি বয়সের কারণে হয়তো বুঝতে পারছেন না, এ জন্যও এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন। এখনও সময় আছে তিনি আত্মম্ভরিতায় না ভুগে এই এক্সাইজ ডিউটি তুলে দিন। এখানে একটি কথা আমি বলব, এক্সাইজ পণ্য বলে কিছু পণ্য আছে, যেমন মাদকদ্রব্য, গাঁজা ইত্যাদি। এগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অত্যন্ত উচ্চহারে কর দিয়ে এগুলো আমদানি করতে হয়। কিন্তু ব্যাংক আমানত তো ওই পর্যায়ে পড়ে না। আমানত তো কোনো এক্সাইজ পণ্য নয়। জানি না কেন আমানতের ওপর অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি পড়ল। আর আমানতের ওপর কোনো ধরনের ট্যাক্স আরোপের অধিকার তো অর্থমন্ত্রীর নেই। উপযুক্ত ক্ষেত্রে একজন উপার্জনকারী সরকারি ট্যাক্স পরিশোধ করার পরই এ টাকা ব্যাংকে রাখছেন। এটা আমানতকারীর নিজস্ব টাকা এবং যা সম্পূর্ণ হালাল টাকা। এ টাকা ব্যাংকে না রেখে যদি টাকার মালিক তা বাসায় রেখে দেন, তাহলে তাকে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না। আমানতকারী যদি নিরাপত্তার খাতিরে তার টাকা ব্যাংকে রাখেন, তাহলে ব্যাংক হয়তো কিছু সার্ভিস চার্জ কর্তন করতে পারে। কিন্তু সরকার কেন তার ওপর ট্যাক্স বসাবে? এতে উদ্বৃত্ত টাকার মালিকরা ব্যাংকে টাকা না রেখে তা নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারেন। এমনকি এই টাকা বাইরে পাচার করে দিতে পারেন। প্রশ্ন হলো, অর্থমন্ত্রী কি টাকা পাচারকারীদের উৎসাহিত করার জন্য এগুলো করছেন? এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। এটি বঙ্গবন্ধুও বলতেন, তা হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি। অর্থাৎ এমন একটি অর্থনীতি চালু করা হবে, যেখানে ধনি-দরিদ্র নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত থাকবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আগামী বছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাবনা করেছেন, তাতে এই মূলনীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। শুধু লঙ্ঘন করা হয়েছে বললে ঠিক বলা হবে না, সম্পূর্ণ উল্টো কাজ করা হয়েছে। এতে গ্রাহকরা ব্যাংকে আসার ক্ষেত্রে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। অর্থমন্ত্রী যা করেছেন তা ইনক্লুসিভ অর্থনীতি নয়, এটা এক্সকু¬সিভ অর্থনীতি। অর্থমন্ত্রী হয়তো এক ধরনের অহংকার বোধ করছেন। আমরা দাবি জানাব, তিনি এ অহংকার থেকে বেরিয়ে আসবেন। কারণ বাজেট তার জন্য নয়, বাজেট জনগণের জন্য। বাজেট জনগণের কল্যাণ চিন্তা করেই প্রণীত হওয়া উচিত।
অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
একটি গণতান্ত্রিক দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাজেটে অর্থমন্ত্রীর এসব কথা বলা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি কী করে বলবেন, তারই নিয়োগ করা চেয়ারম্যান বেসিক ব্যাংক ধ্বংস করেছেন। তারই নিয়োগ করা এমডি এবং অন্যরা মিলে অগ্রণী ব্যাংক ধ্বংস করেছেন। শেষবার অগ্রণী ব্যাংকের এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি বাধাকে অগ্রাহ্য করে পুনর্নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পুনর্নিয়োগপ্রাপ্ত এমডি ব্যাংকটি লুটপাট করে চলে গেছেন। এখন পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করে কী হবে? টাকা তো চলে গেছে। এগুলো তো তিনি সহায়তা করেছেন। তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন মন্ত্রী হিসেবে। কারণ অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষর ছাড়া কোনো এমডি-চেয়ারম্যান নিয়োগ হয় না। এসব কারণেই তিনি বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নিয়ে কিছু বলতে পারেননি। আমরা বাজেটের সমালোচনা করছি। কিন্তু এখানে আমি একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা মুক্তিযুদ্ধের অনুসারী শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে। আমরা জানি, এই সরকারের কিছু হলে এবং জামায়াতিরা ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো দূরে থাক মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে না সন্ত্রাসের কারণে। সে জন্যই এই কথাগুলো বলা। আমরা সরকারের সমালোচনা করছি না। আমরা সরকারবিরোধী নই। আমরা বাজেটের সমালোচনা করছি সরকারের ভালোর জন্য। প্রধানমন্ত্রী এতই ব্যস্ত থাকেন যে, তার পক্ষে সবকিছু জানা সম্ভব নয়। আমি অনুরোধ করব প্রধানমন্ত্রী, আপনি এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করুন। কারণ ক্ষতি হয়ে গেলে শুধু সরকারের ক্ষতি হবে না, আমাদের সবারই ক্ষতি হবে।
ভ্যাটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী প্রথমে বলেছিলেন, সব ক্ষেত্রে একই হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হবে এবং ভ্যাটের হার হবে ১৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে আপত্তি জানানোর পর অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ভ্যাটের হার কমানো হবে। কিন্তু বাজেটে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত জানতে চাই? 
১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ব্যাপারে অনেক নাটক সংঘটিত হয়েছে। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ভ্যাট জনগণের জন্য সহনীয় হওয়া উচিত। এর পরই অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠককালে বলেছেন, হ্যাঁ, ভ্যাট জনগণের জন্য সহনীয় হবে। তারপর কী ঘটল জানি না। সরকারের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, অর্থমন্ত্রী কি তাদের খপ্পরে পড়েছেন? বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী বললেন, ভ্যাট সবার জন্য ১৫ শতাংশ হবে। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের কী মূল্য রইল? সন্দেহ হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী প্রকারান্তরে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের খপ্পরে পড়েছেন। এছাড়া কর আরোপের একটি নীতি আছে। করের নীতি হচ্ছে অধিকসংখ্যক মানুষকে কর জালে আনা; কিন্তু আরোপিত কর হার হবে তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে কর আদায় ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী কর জালকে সংকুচিত করলেন। করের হার নির্ধারণ করা হলো উচ্চ হারে। এটা যেমন করনীতির বিরোধী, তেমনি জনকল্যাণবিরোধী।
 আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটা অর্জন করা কতটা সম্ভব বলে মনে করেন?
আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আমি মনে করি, বাজেট যদি পুরোপুরি না হয়ে আংশিক বাস্তবায়িত হয় এবং অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ভালো থাকে, তাহলে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। এটা তো পরিসংখ্যানের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংক বা সিপিডি তারা এই প্রবৃদ্ধির হারকে বিশ্বাস করতে চাইছে না। আমার কাছে পরিসংখ্যান নেই। চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ততটা সচল ছিল না। তাই ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে সন্দেহ করার কিছুটা কারণ আছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৪ অর্জিত হতে পারে। বাজেট বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত থাকবে। এটা কোনোভাবেই অর্থমন্ত্রী ধরে রাখতে পারবেন না। করনীতি এবং অন্যান্য কিছু পদক্ষেপের কারণে মূল্যস্ফীতির যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেবে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অতিক্রান্ত হলে মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেড়ে যাবে।
ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষণীয়। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সার্বিক বিনিয়োগ আগামী এক বছরে দেড় শতাংশের মতো বৃদ্ধি পাবে। এটা কীভাবে সম্ভব বলে মনে করেন?
বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো পরিবেশ দেশে আছে। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নেই। বাজেটে একটি বিষয় ভালো হয়েছে, তা হলো বিদ্যুৎ,গ্যাস ইত্যাদি সেক্টরে উচ্চহারে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। বরাদ্দ কাগজে-কলমে রাখা এক জিনিস আর বাস্তবায়ন ভিন্ন জিনিস। আমরা আশা করব, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদি খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা যেন সুশাসনের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। এছাড়া দ্রুততার সঙ্গে যেন ব্যয় করা হয়, যাতে আমরা তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হতে পারি। এটা করা গেলে বিনিয়োগ আশানুরূপ বৃদ্ধি পাবে বলে আমি মনে করি। তবে বাজেটে ব্যাংক এবং আমানত নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে, তা যদি কারেকশন করা না হয় তাহলে বিনিয়োগের সুযোগটাকে আমরা হাতছাড়া করে ফেলব।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে অন্যান্য বছরের মতো আগামী বছরের জন্যও সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতকে আলাদা করে দেখালে প্রতীয়মান হয় যে, শিক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আনুপাতিক ব্যয় কমেছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু তা হচ্ছে না। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
সারা বিশ্বেই এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, কোনো জাতি যদি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি অর্জন করতে পারে, তাহলে সে দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে যায়। মানুষ স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনা সরকারের পক্ষে সহজ হয়। সে হিসেবে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের ব্যয় বরাদ্দকে সমর্থন করি। কিন্তু বাজেটে শিক্ষা খাতে খুব একটা বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়নি। শিক্ষা এবং প্রযুক্তি মিলিয়ে বাজেটে এ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা খাতকে আলাদা করে দেখনো হলে বরাদ্দের পরিমাণ কমে যাবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেটের বিরাট অংশই ব্যয় হয়ে যাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। শিক্ষার মানোন্নয়ের জন্য ব্যয় তেমন একটা হবে না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত না করে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যাবে না। বই এবং শিক্ষকদের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আমি মনে করি, ঘোষিত বাজেট দিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে না। এজন্য আলাদা করে বাজেট রাখতে হবে এবং বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
পরিবহন সেক্টরে ভালো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
পরিবহন খাতে ভালো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু এবং এ ধরনের আরও কিছু মেগা প্রকল্প থাকায় পরিবহন খাতে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এক পদ্মা সেতুতেই চলে যাবে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এটা বাঞ্ছনীয়। কারণ এই সেতু কার্যকর হলে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন যুগের সূচনা করবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের একটি অহংকার। বিশ্বব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের একটি ব্যাপার।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন বলে মনে করেন?
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। এখানে আমরা কিছুটা হলেও সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে পারি যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের তুলনায় অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। আগে পুলিশের নাকের ডগায় সন্ত্রাস হতো, পুলিশ ধরতে পারত না। এখন পুলিশ আগের চেয়ে অনেকটাই সক্রিয় হয়েছে। যে কোনো অপরাধীকে তারা ধরতে পারছে। কোনো ঘটনা ঘটার আগেই পুলিশ চক্রান্তকারীদের ধরে ফেলছে। এটি একটি শুভ লক্ষণ। তবে আমাদের আরও অনেকদূর যেতে হবে। কারণ যারা সন্ত্রাস করে তারা অত্যন্ত বড় এবং শক্তিশালী চক্র এবং এদের সঙ্গে বিদেশিদের যোগসূত্র রয়েছে। পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এখনও আমাদের এখানে সন্ত্রাসে মদদ দেয়। কাজেই আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারকে এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন থাকতে হবে।
সাধারণত আমাদের দেশে দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে মুদ্রা পাচার বেড়ে যায়। আগামী অর্থবছরেও কি এ ধরনের আশঙ্কা আছে?
এই আশঙ্কা এবারও আছে। কারণ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে অনেক টাকা লুটপাট হতে পারে। যেহেতু দেশে কিছুটা হলেও সুশাসনের অভাব আছে। আমরা কামনা করব, যাতে এটা না হয়। কিন্তু হওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের মধ্যে অনেকেই আছেন অত্যন্ত ভালো এবং দেশপ্রেমিক। তাদের কাছে আমাদের আবেদন, আপনারা আপ্রাণ চেষ্টা করে দেশের সম্পদ ধরে রাখুন।

সূত্র : আলোকিত বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *