রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে হবে

147শেখ হাসিনা : আমাদের বাংলাদেশে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ মানুষ আজ আশ্রয় নিয়েছে। এখানে আসতে তারা বাধ্য হয়েছে।

এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কারণ একটি দেশের নাগরিক, তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচারের যেসব চিত্র আমরা দেখলাম তা নিন্দা করার ভাষা আমি পাচ্ছি না।

রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই নাগরিক এটা সবারই জানা। ১৯৫৪ সালে বার্মা অর্থাৎ বর্তমান মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উ-নু রোহিঙ্গাদের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী যেমন— কাটিন, কাইয়া, মুন, রাখাইন, সান— এ ধরনের আরও বিভিন্ন প্রায় ১৪৫টির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি আছে। তাদের সবার সঙ্গেই সমান অধিকার এই রোহিঙ্গাদের আছে— সে কথা তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং রেডিওতে তা প্রচার করা হয়েছিল। কাজেই, যে অধিকার তারা একবার দিয়েছিল এবং তাদের ভোটের অধিকার ছিল, সবকিছুই ছিল— কিন্তু সেখানে দেখা গেল যে, ১৯৭৪ সালে এই বার্মা, বর্তমান মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তা এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। আমরা লক্ষ্য করলাম যে, ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন শুরু করেছিল। এরপর তারা ১৯৮২ সালে যে ‘সিটিজেন আইন’ করে সে আইনে একটা চার স্তরবিশিষ্ট সিটিজেনশিপ প্রয়োগ করে। এটা করার উদ্দেশ্যই ছিল এদের অধিকারটা কেড়ে নেওয়া। আর ২০১৫ সালে এসে এই রোহিঙ্গাদের সমস্ত ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। এভাবে একটা জাতির প্রতি এ ধরনের আচরণ মিয়ানমার সরকার কেন করছে, তা সত্যিই আমাদের বোধগম্য নয়।

আমরা বার বার এটার প্রতিবাদ করেছি এবং বিশেষ করে ’৭৮ সালে এক দফা রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৯৮১-৮২, তারপর ১৯৯১-৯২ সালে।

তখন মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা সমঝোতা হয়; যার ফলে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা তাদের নিজের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে। ১৯৭৮ সালে যারা এসেছিল তারাও সবাই চলে গেল। ১৯৮১-৮২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। ১৯৯১-৯২ সালে যারা এসেছিল তাদেরও ফেরত নেওয়া হলো। কিন্তু কিছু রোহিঙ্গা থেকে গেল। সেই সময় রেজিস্টার্ড প্রায় ২৫ হাজারের মতো আর আন-রেজিস্টার্ড বেশকিছু রোহিঙ্গা থেকে গিয়েছিল। তাদের আর ফেরত নেওয়া হলো না। সেখানেই একটা বাধা পড়ল। আমরা বার বার এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বলেছি যে, তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। আমি যতবার মিয়ানমার গিয়েছি মিলিটারি শাসকদেরও আমরা অনুরোধ করেছি, এরা আপনাদেরই নাগরিক, আপনারা তাদের ফেরত নিয়ে যান, এরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এরপরে গণতন্ত্র ফিরে এলো। অং সান সু চি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার সঙ্গে আমার বিভিন্ন সময়ে দেখা হয়েছে। যখনই দেখা হয়েছে তাকেও আমরা এই অনুরোধটা করেছি যে, যারা এখন আমাদের দেশে আছে তাদের ফিরিয়ে নাও। কিন্তু ফিরিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, আমরা দেখলাম ২০১২ সালে আরও এক দফা রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। কারণ তাদের ওপর একটা অমানবিক অত্যাচার শুরু হলো।

এরপর ২০১৫-১৬ সালে, আবার এই ২০১৭ সালে এখন ব্যাপকহারে এসেছে। এই ঘটনার সূত্রপাত ওখানে কোনো একটা গোষ্ঠী তারা মিলিটারির ওপর হামলা করেছে। মিয়ানমারের যে বর্ডার ফোর্স তাদের ওপর হামলা করে বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করেছে। ২০১২ সালে একবার এ ঘটনা ঘটায়। তখনই সাধারণ নাগরিকের ওপর অত্যাচার শুরু হয়।

আবার ২০১৬ এবং ১৯১৭ সালে ঠিক একই ঘটনা ঘটানো হলো। সেখানে অনেক বর্ডার পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। আর্মির ওপরে তারা আক্রমণ করেছে। যার ফলাফলটা হলো যে সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন শুরু হলো। এই নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

যখন মানুষ আসতে শুরু করেছে আমরা দেখেছি নারী, শিশুই বেশি। নৌকাডুবি হয়ে সেখানে শিশুর লাশ নাফ নদে ভাসছে। এমনকি গুলি খাওয়া, মাথায় এবং বুকে গুলি খাওয়া লাশ নদে অথবা সাগরে ভেসে চলে আসছে। সেখানে আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেয়েদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হচ্ছে।

এই দৃশ্য দেখা যায় না! আমরা তো মানুষ! আমাদের ভিতরে তো মনুষ্যত্ব আছে। তাদের আমরা নিষেধ করব কীভাবে? কারণ আমাদেরও তো অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঠিক যেভাবে, যে কায়দায় আমাদের ওপর অত্যাচার শুরু করেছিল, অগ্নিসংযোগ করা, মেয়েদের রেপ করা, মানুষকে হত্যা করা এবং ছোট্ট শিশুকে হত্যা করা— ঠিক সেই ঘটনার দৃশ্য যেন আবার চোখের সামনে ভেসে আসছে। রোহিঙ্গারা জীবনের ভয়ে পালিয়ে আসছে। আমাদের জন্য এটা কঠিন যে, এতগুলো মানুষকে এখানে রাখা, তাদের আশ্রয় দেওয়া। কিন্তু এরা তো মানব জাতি। আমরা তো ফেলে দিতে পারি না। কারণ আমরা তো ভুক্তভোগী, আমরা জানি। আমিও তো রিফিউজি ছিলাম ছয় বছর। ’৭৫-এ যখন আমার মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে হত্যা করল। আমিও তো দেশে আসতে পারিনি। কাজেই একটা রিফিউজি হয়ে থাকা যে কতটা অবমাননাকর সে যন্ত্রণা আমি আর আমার ছোট বোন রেহানা আমরা খুব ভালোভাবে বুঝি। তাই আমরা এদের আশ্রয় দিয়েছি মানবিক কারণে।

কিন্তু আমরা চাই তারা তাদের নিজের ভূমিতে যেন ফিরে যায়। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়— নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়েছেন সেই নীতিমালা অনুসরণ করেই আমরা প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। কারও সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক আমরা চাই না। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়েই থাকতে চাই।

মিয়ানমার সরকারকে আমি এইটুকু বলব যে, তাদের নাগরিক, শত শত বছর ধরে তারা বাস করছে। একসময় তাদের ভোটের অধিকার ছিল। তাদের সবই ছিল। হঠাৎ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া বা তাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা, এর ফলাফল ঠিক কী দাঁড়াতে পারে তা কি তারা চিন্তা করেছে ? কেন তারা এ ধরনের কাজ করছে?

এটা ঠিক যে, একসময় আমাদের দেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হতো প্রতিবেশী দেশে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য। আমি যখন থেকে সরকার গঠন করেছি, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন থেকে আমরা সোজা ঘোষণা দিয়েছি যে, কোনো প্রতিবেশী দেশে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য আমাদের এই মাটি আমরা কাউকে ব্যবহার করতে দেব না। তা আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছি। এ ধরনের কোনো কিছু আমরা করছি না।

বার বার আমাদের বর্ডার গার্ড ও মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশ আলাপ-আলোচনা করছে। আমরা কথাবার্তা বলছি, আলোচনা করছি। কখনো কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে তা জানানো হচ্ছে। যখনই আমাদের কাছে কেউ ধরা পড়ছে, আমরা তাদের হাতে ফেরত দিচ্ছি। আমরা কখনই এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড সমর্থন করব না। কারণ আমাদের একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

আমাদের দেশেও পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা অশান্ত পরিবেশ ছিল। দুই দশক ধরে অর্থাৎ সেই ১৯৭৬ সালে এ সমস্যাটা সৃষ্টি হয় এবং তা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৬ সালে যখন আমরা সরকার গঠন করি, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে আমরা শান্তিচুক্তি করি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিবেশ মোকাবিলা করার জন্য সামরিক কায়দায় সমাধানের চেষ্টা করা হতো। তখন আমাদের দেশে যে সামরিক জান্তারা ক্ষমতায় ছিল তারা ওই পথ অনুসরণ করত।

আমি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে এসে ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, এটা সামরিকভাবে সমাধান করার যোগ্য নয়। এটা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে ছোট্ট একটা সেল গঠন করি। ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে পার্লামেন্টের একটা কমিটি করে আমরা সমস্যার সমাধান করি। আমরা শান্তিচুক্তি করি এবং বাংলাদেশের যারা ভারতে রিফিউজি হিসেবে ছিল তাদের সবাইকে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করি। কারণ আমি মনে করি, যারা আমার দেশের নাগরিক, তারা অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকা আমার দেশের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়। কারণ আমাদের নাগরিক আমাদের দেশেই থাকবে। অন্য দেশে তারা কেন থাকবে? তাই তাদের আমরা ফিরিয়ে এনেছি।

আমি এ কথাটা বার বার মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যখনই আমার কথা হয়েছে তখনই বলেছি। এমনকি এদের পুনর্বাসনের জন্য আমরা এও বলেছি যে, আমরা আমাদের বহু গৃহহারা মানুষ, নদীভাঙা মানুষ, ভূমিহীন মানুষ তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকি। কাজেই আমরা এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করতে পারি। আমাদের অভিজ্ঞতা তারা যাতে কাজে লাগাতে পারে, সে ব্যবস্থা আমরা করে দেব। কিন্তু তারা যেন তাদের লোকগুলো ফেরত নিয়ে যায়।

আমাদের পররাষ্ট্র সচিব বার বার তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সেখানে গেছেন। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেছেন, আলোচনা করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, তারা ফেরত নেওয়া দূরের কথা— এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করল যে, আজকে সমস্ত বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। যখন দেখা যাচ্ছে যে, এভাবে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে এবং তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে।

আমি ঠিক জানি না। বিশ্বব্যাপী আমি যদি তাকাই আমার খুব কষ্ট হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করার একটা মানসিকতা দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানরা রিফিউজি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। আমরা যেমন আয়লানের লাশ দেখেছি সাগরপাড়ে, ঠিক তেমনি নাফ নদে দেখি শিশুদের লাশ। কেন?

আমাদের আর একটা দুর্ভাগ্য হলো যে, আমাদের মুসলিম দেশগুলো বা মুসলিম উম্মাহ যদি এটা অনুভব করতে পারত আর সবাই যদি ঐকমত্যে থাকতে পারত; তাহলে মুসলমানদের ওপর এই অত্যাচারটা কেউ করতে পারত না। আমি বার বার ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেলকে বলেছি। যখন সম্মেলন হয়েছে তখনো বলেছি। আমি বিভিন্ন মুসলিম দেশের নেতার সঙ্গে যখন কথা বলেছি তখনো বলেছি যে, কোনো সমস্যা থাকলে আমরা আলোচনা করি, আমরা সমাধান করি। কিন্তু আমরা অন্যের হাতের খেলার পুতুল কেন হব?

কিন্তু দুর্ভাগ্য, এটা আমি দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাপী এ রকমই একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এখানে কে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ— এটা কোনো কথা নয়। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখি এবং মানবিকভাবে তাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। কারণ, এখানে শুধু মুসলমান নয়, বেশকিছু হিন্দুও নির্যাতিত হয়ে এসেছে। আজকে আমরা যখন দেখি ওই লাশের ছবি, আজকে সত্যিই বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে।

এখানে অনেকেই অং সান সু চির ব্যাপারে কথা তুলেছেন। আপনারা জানেন যে, মিয়ানমারে দীর্ঘদিন মিলিটারি ডিকটেরশিপ চলেছে। কেবল গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। কিন্তু সেখানেও আইন করে অং সান সু চিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি হতে দেয়নি বা সরকারপ্রধান হতে দেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। কাজেই তার ক্ষমতাই বা কতটুকু আছে, তাও আপনাদের একটু বিবেচনা করতে হবে। নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে পার্লামেন্টে, সেখানেও মিলিটারি প্রতিনিধি রয়েছে। পলিসি মেকিংয়ে তারা যা বলবে, তা-ই। তারা ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে। তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করছে। কেন তারা এটা করছে? সেটাই হলো আমাদের প্রশ্ন।

আজকে আমরা মানবিক কারণে তাদের জায়গা দিচ্ছি। আমাদের সমস্যা যে, এত লোক এখানে এসে গেছে, ছোট ছোট শিশুরা, নারীরা; এদের আমরা কোথায় ঠাঁই দেব? আজকে আমরা তাদের জায়গা দিচ্ছি। কারণ আমরা তো অমানুষ হতে পারি না। আমরা তো অমানবিক আচরণ করতে পারি না। কিন্তু মিয়ানমারকে স্পষ্টভাবে মানতে হবে যে, রোহিঙ্গারা তাদেরই নাগরিক; আইন করে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে না।

মিয়ানমারের এক জেনারেল সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন, এরা সবাই বাঙালি। বাঙালি তো শুধু বাংলাদেশে নেই, বাঙালি তো পশ্চিমবঙ্গেও আছে। বাঙালি পৃথিবীর বহু দেশেই আছে। বাঙালি বলেই তাদের তাড়িয়ে দেবে, এটা কেমন কথা? তাদের ভাষা, সবকিছু তো আলাদা, তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ আলাদা, সবই তো বার্মিজ, মিয়ানমারেরই। তো তাদের আবার কালার দেওয়া হবে কেন? আর মানুষ কখনো এদিকে আসে, ওদিকে যায়, এ রকম তো যাতায়াত করতেই থাকে, যুগ যুগ ধরে হয়েছে। তারা এত শত শত বছর ধরে মিয়ানমারেই থেকেছে, ওখানেই তাদের আদিনিবাস। তাহলে তাদের কেন এভাবে বিতাড়িত করা হবে? অত্যাচার করা হবে? এভাবে নির্যাতন করা হবে?

সেই সঙ্গে আমি বলব যে, যারা দুটি পুলিশ মারল, দশটি পুলিশ মারল, কি পাঁচটি মিলিটারি মারল বা একশটি মারল— এটা মেরে তারা কী অর্জন করছে? তারা কি এটা বোঝে না যে, তাদের এসব কারণে আজকে লাখ লাখ মানুষ, যারা নিরীহ, তাদের ঘরবাড়ি পুড়ে যাচ্ছে? তারা মৃত্যুবরণ করছে, তাদের ওপর আঘাত করছে, ছোট ছোট শিশুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, তাদেরই মা-বোনদের ওপর পাশবিক অত্যাচার হচ্ছে। তাহলে এ অত্যাচারের সুযোগটা এরা কেন সৃষ্টি করে দিচ্ছে? আর এ থেকে তারা কী অর্জন করেছে? হয়তো যারা এদের অস্ত্র সরবরাহ করছে, তারা লাভবান হচ্ছে। কারণ অস্ত্র বিক্রি করতে পারছে। এদের অর্থ যারা জোগান দিচ্ছে, হয়তো তারা লাভবান হচ্ছে। কিন্তু আজকে তাদের এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে মিয়ানমারের লোকগুলো কষ্ট পাচ্ছে। আজকে তারা গৃহহারা, ঘরবাড়িহারা, মানবেতর জীবনযাপন করছে।

কাজেই আমি এটা বলব যে, এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। মিয়ানমার সরকারকেও আমরা বলছি যে, আমরা সন্ত্রাসীদের কোনোমতেই প্রশ্রয় দেব না। আমাদের যে সিদ্ধান্ত, তা আমরা সব সময় রক্ষা করি। আমরা কখনো প্রশ্রয় দেব না। কিন্তু মিয়ানমারকেও সে রকম ব্যবহার করতে হবে যে, কয়েকটি লোক, যারা অপরাধী তাদের খুঁজে বের করুন। কিন্তু কিছু ঠকবাজের কথা বলে এরা সাধারণ মানুষকে হত্যা করবে কেন, ছোট ছোট শিশুরা কী অপরাধ করেছে? নারীরা কী অপরাধ করেছে? তাদের ওপর অত্যাচার হবে, তা আমরা কখনো মানতে পারি না। তা কিছুতেই মানা যায় না। কাজেই তাদের এটা বুঝতে হবে। তাদেরই নাগরিক, যারা আজকে বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সবাইকে ফেরত নিতে হবে। সেখানে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা আজকে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে, তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ‘সেইফ জোন’ করে তাদের সেখানে রেখে সব নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করে দিতে হবে। আর রাখাইন রাজ্য থেকে যাদের বিতাড়িত করা হয়েছে, তাদেরও ফেরত নিতে হবে।

আর কফি আনান যে সুপারিশ করেছেন তা বাস্তবায়ন করতে হবে। কফি আনান কমিশন মিয়ানমার সরকারই গঠন করেছে। তারা কফি আনানকে আসতেও দিয়েছে, সেখানে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তাহলে তার সুপারিশ তারা গ্রহণ করবে না কেন? আর যদি সেখানে তাদের কোনো আপত্তি থাকে, তারা আলোচনা করতে পারে। আলোচনা করে তারা যেভাবে হোক এ সমস্যাটা সমাধান করুক। আমাদের এখানে যারা আশ্রয় নিয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে এবং এখন যারা এসেছে, তাদের প্রত্যেক নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে হবে। কারণ এ সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে। এ সমস্যার সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। এটা হলো বাস্তবতা। এখানে যদি কোনোরকম সহযোগিতা লাগে, হ্যাঁ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা সে সাহায্য করব। আমি এটুকু বলতে চাই যে, অনেকে আজকে যারা আমাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে: তাদের আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি। আমি এটুকু বলব যে, এরা আজকে কষ্ট করে আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের এ দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা না করেন। আর কেউ কেউ এখান থেকে নিজেদের ভাগ্য গড়ার চেষ্টা যেন না করেন। আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা যেন না করেন।

১৬ কোটি মানুষকে আমরা খাবার দিই, তার সঙ্গে আরও এ রকম ২-৪-৫ লাখ লোককে খাবার দেওয়ার মতো শক্তি বাংলাদেশের আছে। এটুকু আমি অন্তত বলতে পারি। আমাদের সাধ্যমতো আমরা সে চেষ্টা করে যাব। হ্যাঁ, তার পরও যারা সাহায্য দেবেন ইতিমধ্যে আমাদের কমিটি করা আছে, সেই কমিটির মাধ্যমে তা দিতে হবে। আমাদের প্রত্যেক এলাকায় আমাদের লোক আছে। আর প্রত্যেকে, যারাই ঢুকবে, প্রত্যেকের ছবি তোলা, তাদের নাম-ঠিকানা লেখা এবং তার একটা সম্পূর্ণ হিসাব আমরা ইতিমধ্যে করতে শুরু করেছি। এর জন্য কোনো প্রকল্প নয়। আমি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে এবং কল্যাণ তহবিল থেকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি ইতিমধ্যে। এটা করার জন্য যা যা খরচ লাগে, ইতিমধ্যে আমরা দেওয়া শুরু করেছি এগুলোর সব তালিকা করে। কেউ ২ লাখ বলবেন, কেউ ৫ লাখ বলবেন, কেউ ১০ লাখ বলবেন। যে যারা মতো বলতে থাকবেন, তা নয়। সত্যিকার যারা এসেছে তাদের সম্পূর্ণ ছবি থাকবে, তাদের আইডেনটিটি থাকবে যে, তারা কারা। তাদের আপাতত মানে সাময়িকভাবে একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা, তাও আমরা করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছি। তা আমরা করে দিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে যদি কেউ সহযোগিতা করেন নিশ্চয়ই আমরা তা নেব। কিন্তু আবার এদের এ দুর্দশাকে মূলধন করে কেউ কারও ভাগ্য গড়বেন, তা আমরা করতে দিতে চাই না। কেউ যেন এটা নিয়ে রাজনীতি না করেন; মানে কোনো সাহায্য নেই, সহযোগিতা নেই বড় বড় এক একখানা স্টেটমেন্ট দিয়ে আর বড় বড় কথা বলবেন, তা কিন্তু হবে না, তা আমরা চাই না।

আমি ১৬ তারিখে জাতিসংঘে যাচ্ছি। সেখানে সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেব। নিশ্চয়ই আমি আমার বক্তব্যে মিয়ানমারের বিষয় তুলে ধরব। আমাদের যারা ওখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য আছেন, যেসব প্রতিনিধি আছেন, তাদের সবাই এদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তা ছাড়া, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, আমাদের বর্ডার গার্ড থেকে শুরু করে সবাই এখন সক্রিয় আছেন। সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দলের থেকেও ত্রাণের ব্যবস্থা আমরা করেছি। তারাও কাজ করে যাচ্ছে। মানবতার খাতিরে আমরা এদের পাশে দাঁড়িয়েছি। এদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। কিন্তু এটা সাময়িক ব্যবস্থা। অবশ্যই মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের নিজের ভূমিতে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকেই। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয়, জাতিগত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন, নিপীড়ন বন্ধ, তাদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি।

[১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ থেকে]।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *