কালের সাক্ষী গণমাধ্যম

রুহুল আমিন ভূঁইয়া: উন্নয়নের কথা বলতে গেলেই গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ আসবে। গণমাধ্যমের আগে উন্নয়ন বাস্তবায়নের ভাবনা গাছ লাগানোর আগে ফল চাওয়ার মতো। উন্নয়ন ও গণমাধ্যম এ দুটি শব্দের উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি অপরটি ছাড়া কল্পনা করা যায় না। উন্নয়নে গণমাধ্যমের বহুমাত্রিক ভূমিকা এবং গণমাধ্যম ও উন্নয়ন পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়। সংবাদপত্রকে সমাজ বা জাতির দর্পণ বলা হয়। চলমান জীবন, দেশ ও বিশ্বের একটি চিত্র প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ফুটে ওঠে।

আয়নায় দেখা নিজের চেহারার মতো প্রতিবিম্ব সংবাদপত্রে চলমান জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের চিত্র ভেসে ওঠে। সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়তা করে। মানুষকে সচেতন করে তোলে। দুর্নীতিবাজ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা আতঙ্কে থাকে। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভয়ে তারা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। শোষণ, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা সোচ্চার থাকে। সাংবাদিকদের মেধা, মনন, মানবতাবোধ থেকে উৎসারিত হয় সত্যনিষ্ঠা, নীতিবোধ ও দেশপ্রেম। তাই এসব গুণের অধিকারী সাংবাদিককে বলা হয় জাতির বিবেক। আমাদের সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। তবুও তাদের নিস্তার নেই। তাদেরও অনেক সময় নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় পুলিশ কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিশ্চয় আপনাদের অজানা নেই পুলিশ কর্তৃক ফটো সাংবাদিক নির্যাতনের কথা। আরো একটি কথা না বললেই নয়, কিছুদিন আগে এক নাট্যনির্মাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এক চ্যানেল থেকে টাকা নিয়ে অন্য চ্যানেলে নাটক প্রচারের। এই সংবাদটি প্রথম সারির একটি দৈনিক পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশ হলে পত্রিকার বিনোদন সম্পাদককে ফোন করে ওই নির্মাতা সংবাদটি ডিলেট করে দিতে বলে এবং বলে কাজটি ভালো করেনি সে। তবুও সম্পাদক সংবাদটি ডিলেট করেনি। ডিলেট না করার কারণে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দিয়ে ফোন করিয়ে সংবাদটি ডিলিট করতে বাধ্য করে। এই যদি হয় চিত্র তাহলে একজন সাংবাদিক কীভাবে তার সততা বজায় রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করবে?

সংবাদটি যদি ডিলিট না করে দিত তাহলে ওই সম্পাদকের চাকরি বাঁচানো কঠিন হয়ে দাঁড়াত। তাই নিরুপায় হয়ে সংবাদটি ডিলেট করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক সময়ই বলা হয় বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতারা তা বেশি করে বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নানা ধরনের বাধা উপেক্ষা করেই কাজ করতে হয় সাংবাদিকদের। মামলা আছে, হুমকি আছে, জীবনও দিতে হয়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা আছে, তা হলো মালিকদের বাধা। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন অনেক বেশি প্রশ্ন সাপেক্ষ, অনেক বেশি গণমাধ্যমের মূল চেতনার পরিপন্থী। মালিকদের ব্যবসায়িক আর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক দুর্নীতি, অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক অনিয়ম, দুর্বৃত্তায়নের খবর প্রচার করতে পারে না গণমাধ্যম। আর সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে এই সুযোগটা রাজনৈতিক শক্তি আর দুর্বৃত্তরা বেশি করে পাচ্ছে। ফলে আজ যখন কোনো সাংবাদিক হয়রানি, হুমকি বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন তার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় না।

প্রশ্ন আসে, যদি স্বাধীনতাই না থাকল, তা হলে এতো এতো চ্যানেল, রেডিও, পত্রিকা, সাময়িকী, অনলাইন নিউজ সাইট হচ্ছে কেন? বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রথম সমস্যা তার রাজনীতিকীকরণ। যেভাবে রাজনীতি ঢুকেছে এই পেশায় এতে, বস্তুনিষ্ঠতা নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে যদি চলে সাংবাদিকরা কিভাবে স্বাধীন ভাবে কাজ করবে? তাদের কথা না শুনলে হয়তোবা বিশ্বজিতের মতো অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। হবে আর একজন মায়ের বুক খালি। তাদের আহাজারি শুনবে না কেউ। বাধা আসা সত্ত্বেও গণমাধ্যম কর্মীরা পিছু-পা হাঁটেন না। নানা বাধা প্রতিহত করে সামনের দিকে ধাবিত হয়। হোন অনেক ঘটনার কালের সাক্ষী। গণমাধ্যম কর্মীদের এই রাজনৈতিক বিভাজন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বিভক্তির ফলে সরকারি বা বেসরকারি, কিংবা গোষ্ঠীগত চাপ, কিংবা হুমকি, কোনো ক্ষেত্রেই কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না সাংবাদিকরা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একদিকে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে, তেমনি বিশ্ব গণমাধ্যমেও সাড়া জাগানো ঘটনা। যুদ্ধ সংঘটিত করতে, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে। জনগণের মনে প্রত্যাশা তৈরিতে ও জনমত গঠনে স্বাধীনতার স্বপক্ষে বাংলাদেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য নিয়মিত ও অনিয়মিত পত্রপত্রিকা। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা হয়েছে সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, সংবাদ, কবিতা, গান, কার্টুন ইত্যাদি।

প্রকাশিত পত্রপত্রিকাগুলো আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। গণমাধ্যম সমাজ বিচ্ছিন্ন বা দেশ নিরপেক্ষ কোনো বিষয় নয়, নির্দিষ্ট সমাজ কাঠামোর মধ্যে গণমাধ্যমের আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সমাজের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণের ওপর নির্ভরশীল। আর তাই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সার্বিক উত্থান ও পতনের মাপকাঠিতে গণমাধ্যমের কার্যকলাপ নির্ভর করে। সঙ্গত কারণেই ইতিহাসের নানা ঘটনা প্রবাহের বাঁকে বাঁকে গণমাধ্যমের উপস্থিতি অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা এবং অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। আর তাই সময়ের আবর্তনে এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও কার্যপরিধির বিস্তারও ঘটেছে জনমানুষের আকাক্সক্ষা আর চাহিদার কথা মাথায় রেখে। একই সঙ্গে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা আর মালিকের স্বার্থ অথবা অর্থের জোগানদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো-মন্দের দেখাশোনা করাটাও গণমাধ্যমের টিকে থাকার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দেশের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এছাড়াও বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির স্বর্ণযুগে গণমাধ্যমের কল্যাণে এসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং, নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, ভেজালের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিনিয়ত সচেতন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *