দেশের মাটিতে বিদেশি প্রজাতি

মুকিত মজুমদার বাবু  :  চারপাশের হাজারও প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিভিন্নভাবে মানুষের উপকারে আসে। প্রকৃতপক্ষে এ প্রজাতিগুলোর মধ্যে অনেক প্রজাতি আছে যা দেশি প্রজাতি নয়, বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি। যেসব প্রজাতি নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে নতুন কোনো জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়ে ওই পরিবেশের পরিবর্তন সাধন করে এবং নতুন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় সেগুলোই বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি। প্রজাতিগুলো অন্য কোনো দেশ বা ভিন্ন কোনো প্রতিবেশ ব্যবস্থা থেকে আসে। বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি হতে পারে কোনো উদ্ভিদ, হতে পারে কোনো প্রাণী এমনকি হতে পারে কোনো অনুজীবও। মানুষের উদাসীনতায় বা কখনও কখনও অনিচ্ছাকৃতভাবেই এগুলোর বিস্তার ঘটে। বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তারলাভ করলে সেখানকার মাটি, পানির গুণাগুণ, খনিজ পদার্থের পরিবর্তন তথা পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থার বহুমুখী ক্ষতি হয় এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। যার কারণে ওই এলাকায় দেশি কোনো কোনো উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। দেশি উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল প্রাণিকুলও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিশ্বব্যাপী বাসস্থান ধ্বংসের পরে বিদেশি উদ্ভিদের আগ্রাসনকে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের জন্য বিদেশি প্রজাতির আগ্রাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এ নিয়ে খুব বেশি কাজ কিংবা গবেষণা কোনোটাই আজ পর্যন্ত হয়নি।
হাজার বছরের বিবর্তনের ধারায় প্রতিবেশ ব্যবস্থা একটি নিজস্ব রূপ পায় যেখানে প্রতিটি উদ্ভিদ বা প্রাণীর জন্য থাকে সুনির্দিষ্ট অবস্থান। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা প্রতিবেশ ব্যবস্থার স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী কোনো প্রজাতিই একে অপরের ওপর আগ্রাসী হয় না। অনেক সময় জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সাম্যাবস্থা নষ্ট হওয়ার কারণে প্রতিবেশ ব্যবস্থার ছন্দপতন ঘটে। আর এর ফলশ্রুতিতে জন্ম নিতে পারে আগ্রাসী প্রজাতি। বাংলাদেশের অবস্থান আর্দ্র-ক্রান্তীয় অঞ্চলে হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া, মাটি, পানি ইত্যাদি যে কোনো জীব প্রজাতির দ্রুত বৃদ্ধির সহায়ক। ফলে বিদেশি প্রজাতি খুব সহজেই বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া দেশের প্রাকৃতিক বনে উঁচু গাছ কমে যাওয়ায় সূর্যের আলো সরাসরি গাছের ওপর এসে পড়লে এরা দ্রুত বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। তাছাড়া বিদেশি প্রজাতিগুলো এমনিতেই দ্রুতবর্ধনশীল হয়ে থাকে। কচুরিপানা হতে পারে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির একটি বড় উদাহরণ। এছাড়া ঢোলকলমি, লজ্জাবতী, স্বর্ণলতা, গুয়েগেন্দা (ল্যানটানা), জার্মান বা আসামলতা ইত্যাদি এদেশের অন্যতম আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ। কচুরিপানা পানির ওপরে ভেসে থাকায় সূর্যের আলো ও অক্সিজেন পানির নিচে পৌঁছাতে পারে না। ফলে পানির নিচের অন্যান্য উদ্ভিদ ও ফাইটোপ্লাংকটনকে ঢেকে রাখে এবং দেশি অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ জন্মাতে বাধা দেয়। দক্ষিণ আমেরিকার উদ্ভিদ লজ্জাবতী বন ধ্বংস, মাটির গুণাগুণ নষ্ট ও মাটির ওপরের স্তরের পরিবর্তনের জন্য দায়ী। স্বর্ণলতা একটি ক্ষতিকর পরজীবী উদ্ভিদ। ল্যানটানা তার নিচের স্তরের উদ্ভিদকে জন্মাতে বাধা দেয় এবং মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। এসব উদ্ভিদের কারণে দেশি প্রজাতির উদ্ভিদ উপযোগী পরিবেশগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এসব উদ্ভিদ ছাড়াও বৃক্ষজাতীয় আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, সেগুন, মেহগনি ইত্যাদি বিদেশ থেকে আসা উদ্ভিদ। ইদানীং রাস্তা ও কৃষি জমির ধারে, বাড়ির আশপাশে, সামাজিক বনায়ন এমনকি প্রাকৃতিক বন সৃজনেও এসব গাছ রোপণ করতে দেখা যায়। অথচ দেশে রয়েছে হাজারো নিজস্ব প্রজাতির গাছ। অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বিদেশি গাছ রোপণ করা হচ্ছে যা একেবারেই পরিবেশবান্ধব নয়। মাছের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছ যেমন- তেলাপিয়া, পিরানহা, আফ্রিকান মাগুর ইত্যাদি আমাদের মৎস্য প্রজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ। অথচ বাংলাদেশের রয়েছে ছয় শতাধিক মাছের প্রজাতি। তাই প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির গাছ আর জলাশয়ে বিদেশি মাছ চাষ কখনোই আমাদের কাম্য হতে পারে না।

বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সুফল কুফল নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। যতদূর জানা যায় বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের কুফল রয়েছে। সুফল রয়েছে তার তুলনায় অনেক কম। দেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বা প্রাণী সংরক্ষণ না করে বিদেশি প্রজাতি বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করি তাহলে ক্রমশ দেশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে থাকবে। তাই জীববৈচিত্র্য তথা গোটা পরিবেশকে রক্ষা করতে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির আগ্রাসন বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *