র‌্যাগিং কি নিষ্ঠুর পথ ধরেই চলবে?

 আফতাব চৌধুরী  : আজকের দিনে ‘র‌্যাগিং’ শব্দটা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও সহজ ভাষায় এর প্রকৃত অর্থটা কী, সে সম্পর্কে কেউই মাথা ঘামানোর প্রয়োজনবোধ করেন না। তবুও কলেজস্তরে বিদ্যার্থীদের জীবনে ওই শব্দটার মর্মান্তিক কুপ্রভাব সম্পর্কে সকলেই চিন্তা ব্যক্ত করেন। আমরাও এ সম্পর্কে চিন্তামুক্ত নই। র‌্যাগিং মূলত ইংরেজি শব্দ। এটা পশ্চিমা বিদ্যার্থীদের একটা ঈঁষঃঁৎব, সংস্কার তথা ‘প্রথা’। ইংরেজরাই সাগরপার থেকে এটা বহন করে নিয়ে আসে আমাদের দেশে। দেশটা তখন আর আমাদের ছিল না, ছিল তাদের। ওরাই এ অঞ্চলে ছাত্রজীবনে কলেজস্তরে ‘র‌্যাগিং প্রথা’র প্রবর্তন করে। আমার এক সম্পর্কিত দাদুর মুখে শুনেছি, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিক্যাল বিভাগে পড়াশোনা করতেন। তিনিও ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ নবাগত হিসেবে র‌্যাগিঙের শিকার হয়েছিলেন। প্রবীণরা নবীনদের নিয়ে বিচিত্র ধরনের হাস্যকৌতুকের অবতারণা করেছিলেন। তবে এর উদ্দেশ্য ছিল সৎ। উদ্দেশ্য ছিল অতি মধুর।

তবে ইংরেজ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন আমার দাদু যেভাবে র‌্যাগিঙের সুমধুর পরশ অনুভব করেছিলেন, কালের প্রবাহে ধীরে ধীরে আবর্তিত প্রন্মের হাতে পড়ে র‌্যাগিং তার মাধুর্য এবং উদ্দেশ্য দুটোই আজ পুরোমাত্রায় হারিয়ে ফেলেছে। বলা যায়, র‌্যাগিঙের আশীর্বাদ আজ অভিশাপরূপেই বর্ষিত হচ্ছে নবাগতদের ওপর।

আজকাল মেডিক্যাল বিভাগের ছাত্রাবাসে নরকঙ্কাল দেখিয়ে র‌্যাগিং করা হয়। হঠাৎ করে নিশিরাতে কঙ্কাল দেখে নবাগত পড়–য়াদের অনেকেই ভয়ে মূর্ছা যান। আবার কখনোবা মরা সাপ-ব্যাঙ ছুড়ে ফেলে দেয়া হয় তাদের ওপর। কেবল মেডিক্যাল কলেজগুলোতেই নয়, র‌্যাগিং হয় অন্য কলেজগুলোতেও। র‌্যাগিঙের নামে নবাগতদের শারীরিক নির্যাতন হয় বড়ই নির্মমভাবে। নবাগতদের জন্য এটা যেন এক বিরাট অভিশপ্ত তথা বিভীষিকাময় জগৎ। মেঝেয় এক ঘটি পানি ঢেলে দিয়ে নবীন পড়–য়াদের এর ওপর সাঁতার কাটার আদেশ দেয়া হয়। ব্যাপারটা যে কত নির্মম, নৃশংস তথা মর্মান্তিক তা সহৃদয় ব্যক্তিমাত্রই উপলব্ধি করতে পারছেন।

আবার, বড়দের আদেশ অমান্য করার বিষময় ফল ভীষণ আকার ধারণ করে। এতে কোনো কোনো নবীন পড়ুয়া তাদের মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। এমনকি কারো কারো শখের কলেজ জীবন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

এরূপ জীবননাশী র‌্যাগিঙের দাপটে কেউ কেউ কলেজ জীবনে ইতি টেনে দিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়িতে চলে আসতেও বাধ্য হয়। এসব খবর কে রাখে? বছরকয়েক আগে র‌্যাগিঙের ‘মাস্টার’রা ঢাকা কলেজের এক নবাগত ছাত্রকে রাতদুপুরে কেবলমাত্র অন্তর্বাস পরে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। সেবার চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক ছাত্র নিদারুণ র‌্যাগিঙের দাপটে সেখানকার সমস্ত পাট চুকিয়ে বরাক উপত্যকায় চলে আসতে বাধ্য হন। অবশ্য তার খুঁটির জোরে তিনি পুনরায় চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন।

কেবলমাত্র ছাত্রাবাসগুলোতেই যে র‌্যাগিং হয়, এমন নয়। এর বীভৎস থাবা নখ-দন্ত প্রসারিত করে আছড়ে পড়ে ক্লাসে ক্লাসে, প্রতিটি কমনরুমে। মেয়েরাও মেয়েদের র‌্যাগিং করেন বড়ই নিষ্ঠুরভাবে। তাদের হুকুম তামিল করতে কোনো প্রকারের গড়িমসি কিংবা কসুর করলে ওরা নবাগতদের গালে সজোরে চড়-থাপ্পড়ও কষিয়ে দেন! ব্যাপারটা এরকমই-আজকের নববধূরা বধূ নির্যাতনের ব্যাপারে যেমন করে দক্ষতার সঙ্গে আগামী দিনের শাশুড়ির ভূমিকা পালন করেন, নির্যাতিত নবীন পড়–য়ারাও পরবর্তীকালে ওই একই রূপ ধারণ করেন। আবার সকলেই যে সমানভাবে র‌্যাগিঙের শিকার হন, এমন কথাও সত্যি নয়। এ ব্যাপারে হতভাগা-হতভাগিনী মফঃস্বলের পড়–য়ারাই অধিক নির্যাতন ভোগ করেন। শহরে থাকা চেনাজানাদের প্রায়ই লঘু দণ্ড দিয়েই ছেড়ে দেয়া হয়। তবে যদি কারও প্রতি ব্যক্তিগত

শত্রুতা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সুযোগ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে নেয়া হয়।

মোট কথা, বর্তমানকালে ‘রাগিং’ তার উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে অর্থাৎ রচনাত্মক ভূমিকা ছেড়ে ধ্বংসাত্মক ভূমিকায়ই অবতীর্ণ হয়ে গেছে। এর গতি-প্রকৃতি মোটেই সুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক নয়। মানবসভ্যতার মূলে এটা কুঠারাঘাত করছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আজ মানুষ সেখানে শূন্যে, মহাশূন্যে মানবসভ্যতার রেশ ছড়িয়ে দিতে ব্রত ধারণ করেছে, সভ্যতার নতুন ইতিহাস রচনা করে চলেছে, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এরূপ মানবতাবিরোধী নৃশংস কার্যকলাপ মানবসভ্যতা ধ্বংসের নামান্তর ছাড়া আর কী হতে পারে? এই লজ্জাজনক ‘র‌্যাগিং’ প্রথা বন্ধ করার জন্য কয়েক বছর পূর্বেই আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে কিন্তু প্রশাসনিক শিথিলতায় সে আইন আজও পড়–য়াদের কোনো উপকারে আসেনি।

তাই আর সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে র‌্যাগিঙের নির্মূলে খোদ ছাত্রসমাজকেই অগ্রণীর ভূমিকা নিতে হবে। তবেই কাজের কাজ হবে। এজন্য পড়–য়াদের মানসিকতার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটা অতি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবেই চিরকাল বিরাজ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *