পিয়াজ ফেরাতে পারে কৃষকের সুদিন

বৈচিত্র রিপোর্ট  : কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ট্রল চোখে পড়ল। ট্রলের ছবিতে একজন কুড়িয়ে পাওয়া পিয়াজ প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দিচ্ছেন। শিরোনাম হচ্ছে, পৃথিবীতে এখনো সৎ মানুষ আছে, কুড়িয়ে পাওয়া পিয়াজ ফিরিয়ে দিয়েছেন প্রকৃত মালিকের কাছে। পিয়াজের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মোটামুটি হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল সারা দেশে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ইকোনমিক ক্রাইম ইউনিট পিয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি, বিশ্ববাজারের দাম বৃদ্ধি বা দেশীয় জোগান কম থাকায় নয়, পিয়াজের দাম বেড়েছে কারসাজিতে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পূর্বপরিকল্পনা করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পিয়াজের মজুদ গড়ে তুলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম পাবনার সুজানগরে, গজনার বিলে। সেখানে আদিগন্ত মাঠজুড়ে শুধু পিয়াজের চাষ। ফলন ছিল বাম্পার। কিন্তু কৃষকের অভিযোগ ছিল, দাম মিলছে না তেমন। ফলন বেশি পেয়েও লাভের মুখ দেখার সুযোগ পায়নি কৃষক। গত বছর ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটে’ও কৃষকদের পিয়াজ নিয়ে জোরালো দাবি ছিল, পিয়াজের দাম পাচ্ছেন না কৃষক।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরেও গজনার বিলে পিয়াজ চাষিরা ছিলেন হতাশ। এবার দামের জন্য নয়। পিয়াজের ফলন ভালো হয়নি। পিয়াজ চাষি ওয়াহিদুজ্জামান রাসেল জানিয়েছিলেন, দুই কারণে পিয়াজের ফলন ভালো হয়নি। প্রথম কারণ অসময়ের বন্যা। তারপর ২০-২৫ দিন আগেই ভারি বৃষ্টিপাতে পিয়াজের ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয় কারণটি এবারের প্রচণ্ড শীত আর ঘন কুয়াশা। ফলে যে পিয়াজ প্রতি বিঘায় ৪০ মণ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ফলন কমে গিয়ে ২৫ থেকে ৩০ মণ হয়েছে। এ বছর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়েছিলাম শরীয়তপুরের নাওডুবায়। নাওডুবা মাঠের সোনাফসল মানেই পিয়াজ। স্থানীয়দের দাবি, দেশের সিংহভাগ পিয়াজ উৎপাদন হয় সেখানে। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবে এবার ৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে পিয়াজ চাষ হয়েছে। যার মধ্যে জাজিরা উপজেলাতেই আবাদ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। মাঠের পর মাঠ শুধু পিয়াজ আর পিয়াজ। মাঠে মাঠে পিয়াজ তোলার উৎসব। মাঠজুড়েই শ্রমিকের ব্যস্ততা। নারী-পুরুষ মিলে কাজ করছেন। নেই দম ফেলার ফুরসত। নারী কৃষিশ্রমিকদের কাছে পিয়াজ তোলার মৌসুম হয়ে উঠেছে উপার্জনের মৌসুম। মাঠে কাজের সুযোগ ও মজুরিতে সন্তুষ্ট তারা। নারী শ্রমিকরা সাধারণত পিয়াজের পাতা কাটছেন। তবে একটা সমস্যার কথাও জানালেন তারা। আগের বছরগুলোয় একক সময়ে যে পরিমাণ পিয়াজ কেটেছেন এই বছর তার চেয়ে কম পিয়াজ কাটতে পারছেন। বিষয়টা প্রথমে বুঝতে পারিনি। কেন সময় বেশি লাগবে? সমস্যাটা কোথায়? মাঠে সাজিয়ে রাখা পিয়াজগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘দেখেন পিয়াজগুলোর আকার একেকটা একেক রকম।’ দেখলাম কোনোটা ছোট, কোনোটা মাঝারি, কোনোটা বড়। এই অসম আকৃতির জন্যই পিয়াজ কাটতে সময় লাগছে। কৃষকরা জানালেন, শীতের প্রকোপ আর কুয়াশার কারণে পিয়াজের ফলন হয়েছে এই রকম।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন পিয়াজের চাহিদা। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি করা হয়। আর বাকি চাহিদা মেটে নিজেদের উৎপাদিত পিয়াজে। জাজিরার কৃষক জসিম উদ্দিন বললেন, ‘সরকার পিয়াজ আমদানি করুক। তবে আমাদের দিকটাও সরকারের দেখা উচিত। দেশি পিয়াজটা যখন বাজারে ওঠে ঠিক তখন ভারত থেকে আমদানি করা পিয়াজ বাজার দখল করে ফেলে। ফলে দামটা পড়ে যায়। দেশি কৃষকের কথা চিন্তা করে সরকার ওই সময়টা আমদানি বন্ধ রাখত!’ পাঠক! এটা শুধু পিয়াজের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন আমাদের কৃষকের ফসল ওঠে, তখন আমদানি বন্ধ না রাখার ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মৌসুমের শুরুতে ৭০-৮০ টাকা কেজি বিক্রি করতে পারলেও বর্তমানে প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন। এতেও লোকসান গুনতে হচ্ছে না। কৃষিপণ্যের ভালো মূল্য পেতে স্থানীয় বাজার ছেড়ে দূরের বাজারে পণ্য পাঠাচ্ছেন কৃষক। বাজারের হালচাল এখন তাদের জানাবোঝার মধ্যে। এটি নিঃসন্দেহে ভালো একটি দিক। এখানে আরেকটি ব্যতিক্রম চোখে পড়ল। অনেক কৃষক তার আবাদি খেতে ব্যস্ততা কম থাকায় বাড়তি আয়ের জন্য অন্যের খেতে শ্রম দিচ্ছেন। এটি অবশ্য গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের চিরায়ত একটি বিষয়। সেখানকার মাঠফসলের বৈচিত্র্য বেশ অন্যরকম। চারদিকে নানা মসলা ফসলের আবাদ। ফসলের ঘ্রাণে ভরে ওঠে মন। অনেকেই আবার একই জমিতে আবাদ করছেন কয়েক রকমের ফসল। কেউ পিয়াজের সঙ্গে চাষ করেছেন ধনিয়া, কেউ মিষ্টিকুমড়ার। কৃষক জানিয়েছেন, পিয়াজের সাথী ফসলের জন্যই তারা ভারসাম্য রাখতে পারছে লাভ ও লোকসানের। একটা ফসলে লোকসান হলে, ক্ষতিটা কাটিয়ে ওঠেন অন্য ফসল দিয়ে। আর সাথী ফসলের অবশিষ্টাংশ মেটাচ্ছে জৈব সারের চাহিদা আর সাথী ফসলের বিক্রয়লব্ধ অর্থ তারা খরচ করছেন শ্রমিকের পেছনে।

পিয়াজ চাষে স্বয়ম্ভর হতে হলে তিনটি বিষয়ে আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। এক. উচ্চফলনশীল ও দীর্ঘদিন মজুদ রাখা যায়, এমন জাত উদ্ভাবন। দুই. পিয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা। তিন. পিয়াজের বাজার হতে হবে কৃষকবান্ধব।

কৃষকদের হাত ধরেই কৃষকের মাঠের বৈচিত্র্য বদলাচ্ছে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে কৃষক যেমন আন্তরিক হয়ে উঠছেন একইভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারেও তারা দারুণ উৎসাহী। কৃষক এখন বছরে তিন থেকে চারটি ফসল ফলান। এতসব তৎপরতার পেছনে উদ্দেশ্য একটিই, সঠিক মূল্য পাওয়া। তারা প্রত্যাশা করে অনুকূল একটি বাজারকাঠামো; যাতে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত হয়। জাজিরার বড়কান্দি বাজারে এসে দেখা গেল বাজারদর কৃষকের অনুকূলে। তবে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েরই চাওয়া পণ্যের সঠিক মূল্য পেতে বাজার চাহিদা নিরূপণ করার প্রয়োজন রয়েছে। তাহলে উৎপাদন ও আমদানির হিসাবটিও অনেক আগে থেকেই নিরূপণ করা সম্ভব হয়। একটি সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা কৃষককে যেমন সন্তুষ্ট করতে পারে, একইভাবে সন্তুষ্ট করতে পারে ভোক্তাকেও। দেশের প্রতিটি এলাকায় কৃষকের মাঠে সৃষ্টি হয়েছে অভূতপূর্ব ফসল-বৈচিত্র্য। এখন এক ইঞ্চি জমিও কৃষক ফেলে রাখেন না; সেই সঙ্গে সাথী ফসল, আন্তফসলের আবাদ তো রয়েছেই। এই সময়ে শুধু অনুকূল বাজারকাঠামোই কৃষককে তার কাঙ্ক্ষিত পথে আরও একটু এগিয়ে নিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *