কোন পথে আফগানিস্তান?

কোন পথে আফগানিস্তান?

কোন পথে আফগানিস্তান?
ছবি: সংগৃহীত

ড. মো. নাজমুল ইসলাম :তালেবান ১৯৯৪ সালে একটি জাতীয়তাবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসাবে আফগানিস্তানের কান্দাহারে অনেকটা কর্তৃত্বের জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তারা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছিল। তালেবানের ভাবাদর্শ ছিল দেওবন্দীর চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত এবং এর নিয়মগুলো ছিল ইসলামি শরিয়ার নিজস্ব ব্যাখ্যাভিত্তিক, যেখানে তারা নিজেদের বিচার-বিবেচনা এবং সুবিধামতো ইসলামের আইনকানুনকে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করে।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, তারা মাদ্রাসাগুলোয় সৌদি পৃষ্ঠপোষক উগ্র ওহাবি মতবাদগুলোর ওপর জোর দেয় আর এর সঙ্গে পশতুনদের প্রাক-ইসলামি উপজাতীয় নিয়মকানুন একসঙ্গে করে নতুনভাবে শরিয়ার ব্যাখ্যা দেয়। বর্ণনামূলক মূল্যায়ন, পদ্ধতিগত অমিল এবং রাজনৈতিক দর্শন বাদ দিয়ে যদি তালেবানকে বুঝতে হয়-সেক্ষেত্রে সহজভাবে তালেবান হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত মুজাহিদিন গোষ্ঠীর এক চূড়ান্ত ফসল, যারা ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

আফগান জনগণের ৯৯.৭ শতাংশই মুসলমান-৯০ শতাংশ সুন্নি এবং ১০ শতাংশ শিয়া। তবে জাতিগতভাবে আফগানিস্তান হলো একটি বহুজাতিক গোষ্ঠীভুক্ত দেশ-যেখানে ৪২ শতাংশ পশতুন, ২৭ শতাংশ তাজিক, ৯ শতাংশ হাজারা, ৯ শতাংশ উজবেক, ৪ শতাংশ আইমাক, ৩ শতাংশ তুর্কমেন, ২ শতাংশ বেলুচ এবং ৪ শতাংশ অন্যান্য। লক্ষ করা গেছে, তালেবানের শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই আসে আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পূর্বাংশের একটি নির্দিষ্ট পশতুন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী থেকে।

তবে তারা আফগানিস্তানের রাজনীতি ও সাংস্কৃতির ওপর নিজেদের পশতুন জাতিগত কর্তৃত্ব আড়ালে রাখার জন্য শরিয়াভিত্তিক ইসলামি আইন ব্যবহার করে। অনেক পর্যবেক্ষকের বিশ্লেষণ অনুসারে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার সাহায্যপ্রাপ্ত মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহ সরকারের বিরুদ্ধে মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর চার বছরের (১৯৯৯-৯৬) যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক সহায়তায় তালেবান গঠিত হয়।

যদিও পাকিস্তান বরাবরের মতোই তালেবান গঠন ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। কারণ তারা নিজেরাও তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তালেবান সমস্যার সম্মুখীন। মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনুমেয় গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে পশতুনদের অধীন অংশটি ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে কাবুলে প্রবেশ করে। আফগানিস্তানের মাদ্রাসাভিত্তিক একজন ওস্তাদ মোল্লাহ মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে এই অংশ আফগানিস্তানকে ইসলামি আমিরাত ঘোষণা দেয়।

তথাপি ২০০১ সালের আগ পর্যন্ত তালেবান হয় বলপ্রয়োগ অথবা জাতিগত সহানুভূতি কিংবা ওহাবি মতবাদের ভাবাদর্শের নমনীয় সংস্কারের মাধ্যমে আফগানিস্তানের অন্তত ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতা হারানোর পর ২০১০ সাল থেকে তালেবানরা বহু এলাকা দখল করে, বিশেষ করে আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশের এলাকাগুলো, যা পরবর্তীকালে ন্যাটোর সাহায্যপ্রাপ্ত এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত আফগান সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার প্রতিরোধ শক্তি ফিরে পায়।

এর পাশাপাশি গত কয়েক মাসে তালেবানরা চীন, ভারত, রাশিয়া, ইরান, পাকিস্তানসহ বহু আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী প্রতিনিধির সঙ্গে গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে সাক্ষাৎ করেছে। শান্তিচুক্তি করেছে তুরস্কের সঙ্গে। তালেবানরা হয়তো অনুধাবন করছে যে, যদি তারা আবার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলের মতো কঠোর নীতি অব্যাহত রাখে, তাহলে সেটা তাদের জন্য এক বিরাট ভুল হবে।

এটা সত্য যে, অভ্যন্তরীণ নীতির জন্য তালেবানরা পুরোপুরি স্বতন্ত্র, তবে মজবুতভাবে অভ্যন্তরীণ নীতি ধরে রাখার জন্য তাদের অবশ্যই বৈদেশিক সম্পর্ক থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে আঙ্কারার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে বরং আরও লাভবান হতে পারে তারা-তা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সহায়তা যা-ই হোক না কেন।

এটা প্রতীয়মান যে, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করবে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার, তালেবান, আফগান জাতিগত সংখ্যালঘু-তাজিক, উজবেক, তুর্কমেন ইত্যাদি; আঞ্চলিক শক্তি-পাকিস্তান, ইরান, চীন ও ভারত এবং আন্তর্জাতিক শক্তি-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব-এই পক্ষগুলোর ওপর। আফগানিস্তানের নতুন ইতিহাস নির্ধারণ করবে আফগান প্রশাসন ও তালেবান নেতৃত্ব।

যদি তারা গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে সমর্থ হয়, তবে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ হবে অহিংস। অন্যদিকে, যদি এক দল সম্মতি প্রদানে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আবার অতীতে ফিরে যাবে-যেখানে গৃহযুদ্ধ, স্বৈরাচারিতা ও ধর্মভিত্তিক উগ্র ভাবাদর্শের মতবাদ দেশকে হতাশাগ্রস্ত এবং পরস্পরবিরোধীভাবে পরিচালিত করবে।